![]() |
| আন্তর্জাতিক জাহাজে চাকরি |
আন্তর্জাতিক জাহাজে ক্যারিয়ার: কীভাবে শুরু করবেন? (যোগ্যতা, বেতন ও বিস্তারিত তথ্য)
পুরো বিশ্ব ঘুরে দেখার সুযোগ, সাথে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরি—এমন স্বপ্নের কথা ভাবলেই প্রথমে মাথায় আসে আন্তর্জাতিক জাহাজের বা মার্চেন্ট নেভির (Merchant Navy) কথা। সমুদ্রের বিশালতায় রোমাঞ্চকর জীবনযাপন এবং ডলারে উপার্জনের কারণে তরুণ প্রজন্মের কাছে জাহাজে চাকরি এখন অন্যতম জনপ্রিয় একটি পেশা।
তবে অনেকেই জানেন না যে, কীভাবে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক মানের জাহাজে চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা জাহাজে চাকরির ধরন, শিক্ষাগত ও শারীরিক যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ এবং বেতনসহ খুঁটিনাটি সব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
জাহাজে চাকরির বিভাগসমূহ
আন্তর্জাতিক জাহাজে মূলত তিনটি প্রধান বিভাগে কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। আপনার যোগ্যতা এবং আগ্রহের ওপর ভিত্তি করে আপনি যেকোনো একটি বিভাগ বেছে নিতে পারেন:
১. ডেক ডিপার্টমেন্ট (Deck Department)
এই বিভাগের প্রধান কাজ হলো জাহাজ পরিচালনা করা, নেভিগেশন (দিক নির্ণয়), এবং জাহাজের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই বিভাগের সর্বোচ্চ পদ হলো 'ক্যাপ্টেন' বা মাস্টার। এখানে ডেক ক্যাডেট হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করে চিফ অফিসার থেকে ক্যাপ্টেন হওয়া যায়।
২. ইঞ্জিন ডিপার্টমেন্ট (Engine Department)
জাহাজের ইঞ্জিন রুম পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামতের দায়িত্ব থাকে এই বিভাগের ওপর। ইঞ্জিন ক্যাডেট হিসেবে শুরু করে পর্যায়ক্রমে পদোন্নতি পেয়ে 'চিফ ইঞ্জিনিয়ার' হওয়া যায়। এছাড়াও এই বিভাগে ফিটার, মেকানিক এবং ওয়েল্ডার হিসেবেও কাজের সুযোগ রয়েছে।
৩. ক্যাটারিং এবং হসপিটালিটি ডিপার্টমেন্ট (Catering & Hospitality)
যাত্রীবাহী ক্রুজ শিপ (Cruise Ship) বা সাধারণ কার্গো জাহাজে নাবিকদের খাবার ও বাসস্থানের দেখভালের জন্য এই বিভাগ কাজ করে। শেফ (বাবুর্চি), স্টুয়ার্ড, এবং ক্রুজ শিপের ক্ষেত্রে হোটেল ম্যানেজমেন্টের বিভিন্ন পদে এখানে প্রচুর লোক নিয়োগ হয়।
শিক্ষাগত যোগ্যতা
বিভাগ এবং পদের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষাগত যোগ্যতা ভিন্ন হয়ে থাকে:
- ক্যাডেট অফিসার (ডেক ও ইঞ্জিন): অফিসার র্যাঙ্কে যোগ দিতে চাইলে আপনাকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি (SSC) এবং এইচএসসি (HSC) পাস হতে হবে। বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান এবং উচ্চতর গণিতে ভালো ফলাফল থাকতে হয়। পাশাপাশি ইংরেজিতে দক্ষতা থাকা বাধ্যতামূলক।
- রেটিং বা ক্রু (Rating): সাধারণ ক্রু বা সি-ম্যান (Seaman) হিসেবে কাজ করতে চাইলে ন্যূনতম এসএসসি (SSC) পাস হতে হয়।
- ক্যাটারিং বিভাগ: এই বিভাগে কাজের জন্য এসএসসি পাসের পাশাপাশি রন্ধনশিল্প বা হোটেল ম্যানেজমেন্টের ওপর ডিপ্লোমা কোর্স করা থাকলে অগ্রাধিকার পাওয়া যায়।
Related Posts
শারীরিক ও মেডিকেল যোগ্যতা
সমুদ্রে জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটাতে হয় বলে এখানে শারীরিক ফিটনেস অত্যন্ত জরুরি।
- দৃষ্টিশক্তি: ডেক ডিপার্টমেন্টের জন্য চোখের দৃষ্টি ৬/৬ হওয়া বাধ্যতামূলক। কোনোভাবেই কালার ব্লাইন্ড (Color Blindness) বা বর্ণান্ধ হলে ডেক বা ইঞ্জিন বিভাগে চাকরি হবে না।
- উচ্চতা ও ওজন: সাধারণত ন্যূনতম উচ্চতা ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি (প্রতিষ্ঠান ভেদে কম-বেশি হতে পারে) এবং উচ্চতা অনুযায়ী বয়স ও ওজনের সামঞ্জস্য থাকতে হয়।
- মেডিকেল টেস্ট: আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থার (IMO) নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদিত ডাক্তার দ্বারা সম্পূর্ণ মেডিকেল ফিটনেস সার্টিফিকেট (Medical Fitness Certificate) নিতে হবে।
বাংলাদেশ থেকে কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন?
বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক জাহাজে চাকরির জন্য বেশ কিছু সরকারি ও বেসরকারি একাডেমি রয়েছে:
- বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি (BMA): এটি দেশের সবচেয়ে পুরোনো এবং স্বনামধন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রতি বছর এইচএসসি পাসের পর এখানে ডেক এবং ইঞ্জিন ক্যাডেট হিসেবে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। লিখিত, মৌখিক এবং মেডিকেল টেস্টের মাধ্যমে এখানে ক্যাডেট নির্বাচন করা হয়।
- ন্যাশনাল মেরিটাইম ইন্সটিটিউট (NMI): যারা রেটিং (সাধারণ ক্রু) হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান হলো ন্যাশনাল মেরিটাইম ইন্সটিটিউট। এখানে বিভিন্ন ট্রেডে কোর্স করানো হয়।
- বেসরকারি মেরিন একাডেমি: সরকারি একাডেমির পাশাপাশি বাংলাদেশে বেশ কিছু অনুমোদিত বেসরকারি মেরিন একাডেমি রয়েছে যেখান থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া যায়। তবে ভর্তির আগে অবশ্যই যাচাই করে নেবেন একাডেমিটি বাংলাদেশ নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত কি না।
প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস ও সার্টিফিকেট
জাহাজে ওঠার আগে আপনাকে কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস সংগ্রহ করতে হবে:
- CDC (Continuous Discharge Certificate): এটি একজন নাবিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট, যাকে সি-ম্যান বুকও বলা হয়। মেরিন একাডেমি থেকে কোর্স শেষ করার পর এটি সংগ্রহ করতে হয়।
- পাসপোর্ট: আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য একটি বৈধ পাসপোর্ট থাকা বাধ্যতামূলক।
- STCW কোর্স: সমুদ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা, আগুন নেভানো এবং নিজের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বেসিক কিছু কোর্স (যেমন: STCW) করা থাকতে হবে।
জাহাজে চাকরির সুবিধা ও বেতন
জাহাজে চাকরির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর বেতন এবং সুযোগ-সুবিধা:
- আকর্ষণীয় বেতন: একজন ক্যাডেট হিসেবে শুরুতে বেতন ৩০০-৫০০ ডলার হলেও, প্রমোশন পেয়ে ক্যাপ্টেন বা চিফ ইঞ্জিনিয়ার হলে মাসে ৫,০০০ থেকে ১৫,০০০ ডলার বা তারও বেশি আয় করা সম্ভব। রেটিংদের বেতনও সাধারণ যেকোনো চাকরির তুলনায় অনেক বেশি।
- বিনা খরচে থাকা-খাওয়া: জাহাজে থাকাকালীন থাকা, খাওয়া এবং চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ কোম্পানি বহন করে। ফলে আয়ের প্রায় পুরো অংশই সঞ্চয় করা যায়।
- বিশ্ব ভ্রমণ: বিনামূল্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ একমাত্র এই পেশাতেই সম্ভব।
- ট্যাক্স-ফ্রি আয়: বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট সময় (সাধারণত ৬ মাসের বেশি) দেশের বাইরে থাকার কারণে নাবিকদের আয়ের ওপর কোনো আয়কর দিতে হয় না।
কিছু চ্যালেঞ্জ বা অসুবিধা
সবকিছুরই যেমন ভালো দিক আছে, তেমনি কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। এই পেশায় আসার আগে এই বিষয়গুলো মাথায় রাখা উচিত:
- মাসের পর মাস পরিবার ও আপনজনদের থেকে দূরে থাকতে হয়।
- সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়া এবং সি-সিকনেস (Sea sickness) মানিয়ে নিতে হয়।
- কাজের চাপ অনেক বেশি থাকে এবং ২৪ ঘণ্টা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।
সর্বশেষ কথা
আন্তর্জাতিক জাহাজে ক্যারিয়ার গড়া যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনি সম্মানজনক এবং লাভজনক। আপনার যদি অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ হয়, শারীরিক ও মানসিকভাবে আপনি যদি দৃঢ় হন, তবে মার্চেন্ট নেভি হতে পারে আপনার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত এবং কঠোর পরিশ্রম আপনাকে পৌঁছে দিতে পারে আপনার স্বপ্নের গন্তব্যে।
