বাংলাদেশে শুক্রবার সকালে আঘাত হানা ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প দেশকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিল যে, আমরা ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি অঞ্চলে বসবাস করি। সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে নরসিংদীর মাধবদীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই কম্পন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তীব্রভাবে অনুভূত হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এতে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৭ জনের মৃত্যু ও অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মৃতদের মধ্যে পুরান ঢাকার বংশালে রেলিং ধসে পড়ে তিনজন পথচারী, নারায়ণগঞ্জে দুজন এবং নরসিংদী অঞ্চলে আরও দুজন প্রাণ হারিয়েছেন। আতঙ্কে রাস্তায় নেমে আসা হাজার হাজার মানুষ এবং ভবন থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার সময় ছোট-বড় দুর্ঘটনায় অনেকেই আহত হয়েছেন।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির জানিয়েছেন, গত কয়েক দশকে ঢাকা ও এর আশপাশে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, “আমাদের অঞ্চলের ঐতিহাসিক রেকর্ড বলছে, এখানে ৭ থেকে ৮ মাত্রার বড় ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কবে হবে তা বলা সম্ভব নয়, কিন্তু প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে।”
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. হুমায়ুন আখতার বলেছেন, ১৮৮৫ সালের মানিকগঞ্জ ভূমিকম্প এবং ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্পের মতো বড় ধ্বংসাত্মক ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেকোনো সময় হতে পারে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা বছরের পর বছর বলে আসছি— ভূমিকম্প মহড়া, ভবন কোড বাস্তবায়ন, জরুরি উদ্ধার দল গঠন এসব অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বাস্তবে কার্যকর পদক্ষেপ খুবই কম দেখা যায়।”
এই ভূমিকম্প আমাদের সামনে আবারও প্রশ্ন তুলেছে— আমরা কি সত্যিই প্রস্তুত? ঢাকা শহরে লাখ লাখ মানুষ যে ভবনগুলোতে বাস করে, তার বেশিরভাগই ভূমিকম্প সহনশীল নয়। রাস্তাঘাট সরু, জরুরি যান চলাচলের ব্যবস্থা নেই, হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা নেই। একটি বড় ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা কল্পনা করাও কঠিন।
এখনই সময়, সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ সবাই মিলে একটি সমন্বিত প্রস্তুতি নেওয়ার। ভূমিকম্প আসবেই, কিন্তু তার ধ্বংসলীলা কমানো আমাদের হাতে।
আসুন, আজকের এই ঘটনাকে শুধু খবর হিসেবে না নিয়ে একটি জাগরণ হিসেবে গ্রহণ করি।
