![]() |
| পৃথিবীর সর্বোচ্চ শহর লা রিনকোনাদা: চরম বৈরী পরিবেশে মানুষের জীবনযাত্রা |
পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থান কোনটি? চরম বৈরী পরিবেশে কীভাবে টিকে আছে মানুষ?
পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ৮৩০ কোটি মানুষের বসবাস। এর বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র ৮ কোটির মতো মানুষ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অন্তত ৮ হাজার ২০২ ফুটের বেশি উচ্চতায় বসবাস করেন। পাহাড়ের চূড়ায় বা উঁচু অঞ্চলে ঘুরতে গেলে সমতলের মানুষের অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠা বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কারণ যত উপরে ওঠা যায়, বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ তত কমতে থাকে। যেখানে সাধারণ মানুষের কয়েকদিন থাকতেই দম আটকে আসে, সেখানে বছরের পর বছর ধরে মানুষ কীভাবে এত উঁচুতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে? চলুন জেনে নিই পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থান এবং সেখানে বসবাসকারী মানুষদের বিস্ময়কর জীবনযাত্রা সম্পর্কে।
পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু লোকালয়গুলো কোথায়?
পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থায়ী বসতিগুলোর তালিকা করলে চীনের চিংহাই প্রদেশের 'ওয়েনকুয়ান' শহরের নাম প্রথম দিকেই থাকবে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৫ হাজার ৯৮০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এর পরেই রয়েছে ভারতের প্রায় ১৫ হাজার ফুট উচ্চতার 'করজোক' গ্রাম। তবে উচ্চতা এবং বৈরী পরিবেশের দিক থেকে এই সব জায়গাকে ছাড়িয়ে গেছে পেরুর একটি দুর্গম শহর।
পেরুর লা রিনকোনাদা: ‘ডেভিলস প্যারাডাইস’ বা শয়তানের স্বর্গ
পেরুর আন্দিজ পর্বতমালায় অবস্থিত ‘লা রিনকোনাদা’ (La Rinconada) শহরটি বর্তমানে পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থায়ী বসতি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬ হাজার ৪০৪ ফুট থেকে ১৭ হাজার ৩৮৮ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই শহরে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বাস। এত উঁচুতে পৃথিবীর আর কোথাও কোনো শহর বা লোকালয় নেই। দুর্গম পথ এবং চরম বৈরী আবহাওয়ার কারণে এই শহরকে ‘ডেভিলস প্যারাডাইস’ নামেও ডাকা হয়।
লা রিনকোনাদার কঠিন জীবনযাত্রা
লা রিনকোনাদার জীবনযাত্রা অত্যন্ত কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং। অবাক করার মতো বিষয় হলো, এখানে সুপেয় পানির কোনো লাইন নেই, এমনকি আধুনিক পয়োনিষ্কাশন বা ময়লা ফেলারও কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। এখানকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন খাবার প্রতিদিন পাহাড়ের নিচ থেকে বয়ে আনতে হয়। ২০০০ সালের পর এই দুর্গম পাহাড়ি শহরে প্রথম বিদ্যুৎ-সংযোগ পৌঁছায়।
এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মানুষ এখানে কেন থাকছে? মূলত প্রায় ৬০ বছর আগে এটি সোনা তোলার একটি অস্থায়ী খনি অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে এখানকার বাসিন্দারা সোনার খোঁজেই এই চরম প্রতিকূল পরিবেশে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছেন। তবে সোনার খোঁজের এই মূল্য দিতে হচ্ছে জীবন দিয়ে। কারণ, এখানকার বাতাসে অক্সিজেনের চাপ সমতলের চেয়ে প্রায় অর্ধেক।
অক্সিজেন সংকটে মানবদেহ কীভাবে সাড়া দেয়?
সমতলে বসবাসকারী কেউ হঠাৎ লা রিনকোনাদার মতো উচ্চতায় গেলে তার শ্বাসপ্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ১৪ হাজার ৭৬৩ ফুট উচ্চতায় উঠলে সমতলের তুলনায় বাতাসে মাত্র ৬০ শতাংশ অক্সিজেন পাওয়া যায়।
অক্সিজেনের এই বিশাল ঘাটতি পূরণে শরীরের বিভিন্ন কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দিতে ফুসফুস ও হৃৎপিণ্ডকে স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। এর ফলে ‘অ্যাকিউট মাউন্টেন সিকনেস’ বা উচ্চতাজনিত অসুস্থতা দেখা দেয়। হঠাৎ উঁচুতে উঠলে তীব্র মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, ক্লান্তি এবং খাওয়ার রুচি চলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। মূলত কম অক্সিজেনের কারণে ফুসফুস ও মস্তিষ্কে চাপ পড়ায় এমনটি ঘটে।
চরম পরিবেশের সাথে মানুষের শারীরিক অভিযোজন
লা রিনকোনাদার মতো চরম উচ্চতায় যারা স্থায়ীভাবে বসবাস করেন, তাদের শরীর এই কম অক্সিজেনের সাথে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে। বিশ্বজুড়ে হওয়া বিভিন্ন গবেষণা থেকে স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে, যারা একদম ছোটবেলা থেকে এমন উচ্চতায় বাস করেন, বড় হওয়ার সাথে সাথে তাদের ফুসফুসের আকার সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশ বড় হয়ে যায়।
আন্দিজ পর্বতের বাসিন্দাদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের ঘনত্ব অনেক বেশি থাকে, যা কম অক্সিজেনযুক্ত পরিবেশেও শরীরকে সচল রাখতে সাহায্য করে। তবে রক্ত অতিরিক্ত ঘন হওয়ার কারণে তাদের অনেকেই ‘ক্রনিক মাউন্টেন সিকনেস’ নামক এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পাহাড়ি রোগে ভোগেন। ধারণা করা হয়, খনি শহর লা রিনকোনাদার প্রতি চারজন বাসিন্দার মধ্যে একজন এই রোগে ভুগছেন।
অন্যদিকে, তিব্বতের পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষেরা এর চমৎকার ব্যতিক্রম। তীব্র উচ্চতায় বাস করলেও তাদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা খুব একটা বাড়ে না, ফলে তারা ক্রনিক মাউন্টেন সিকনেস রোগ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকেন। বিজ্ঞানীদের মতে, তিব্বতিদের শরীরে ‘ইপিএএস১’ (EPAS1) নামের একটি বিশেষ জিনের মিউটেশন রয়েছে, যা রক্তে হিমোগ্লোবিনকে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বাড়তে দেয় না। এর বদলে তাদের শরীর রক্তনালির ভেতর রক্তের প্রবাহ বা গতি বাড়িয়ে দিয়ে এই কম অক্সিজেনের সাথে চমৎকারভাবে মানিয়ে নিয়েছে।
